প্রযুক্তি খাতের উত্থান, শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসার বিস্তার বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি ও বাড়তি জীবনযাত্রার খরচের কারণে অনেক সাধারণ কর্মীকে একাধিক চাকরি করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ বৈষম্য নিয়ে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণ কর্মীদের আয় ও জীবনমানের ব্যবধান আরো বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, দেশটিতে সম্পদ বণ্টনের ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপও তীব্র হচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের একজন ইলোন মাস্কের সম্পদ সাময়িকভাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। যদিও পরে তা কিছুটা কমে আসে। গত এক বছরে তার সম্পদ প্রায় ৩২৭ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। বিশেষ করে স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর মাস্কের সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে কয়েক কোটি শ্রমজীবী মানুষ ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে জীবনযাপন করছে। ক্যালিফোর্নিয়ার নিরাপত্তাকর্মী গিলবার্তো রুবিও জানান, তিনি একসময় খরচ কমাতে খাবারের পরিমাণ কমানোর কথা ভাবতে বাধ্য হন।
অর্থনীতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী দশমিক ০০০০১ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ২০ জন ব্যক্তি দেশটির জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশ সমপরিমাণ সম্পদের মালিক। এ হার যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘গিল্ডেড এজ’ সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
কর সংস্কারবিষয়ক সংগঠন আমেরিকানস ফর ট্যাক্স ফেয়ারনেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৯৮৯ জন বিলিয়নেয়ারের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এক বছরের ব্যবধানে এ সম্পদ প্রায় ৩২ শতাংশ বেড়েছে।
কিন্তু একই সময়ে শ্রমিকদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট অর্থনীতিতে শ্রমিকদের হিস্যা ১৯৪৭ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ওই বছর দেশটির জিডিপির মাত্র ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ শ্রম আয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২ শতাংশে। অথচ আগের এক বছরে মজুরি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ কর্মী ঘণ্টাপ্রতি ২৫ ডলারের কম আয় করেন। অথচ ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) লিভিং ওয়েজ ক্যালকুলেটর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বড় শহরে একক একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনযাপনের জন্য ঘণ্টায় ২৫ ডলারের বেশি আয় প্রয়োজন।
প্রতিবেদন বলছে, মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় অনেক মানুষ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ড দেনার পরিমাণ রেকর্ড ১ দশমিক ২৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২১ সালের তুলনায় যা ৬৩ শতাংশ বেশি।
গিলবার্তো রুবিও চার বছর ধরে সানফ্রান্সিসকো এলাকায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে তাকে একসঙ্গে তিনটি চাকরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকি বাসা ভাড়ার চাপ সামলাতে তিনি একসময় নিজের গাড়িতেও বসবাস করেছেন।
রুবিও বলেন, একটি চাকরি করে তিনি কখনই আর্থিকভাবে এগোতে পারেননি। সঞ্চয় নেই, অবসরকালীন পরিকল্পনা নেই, এমনকি নিজের একটি বাড়ি কেনার সামর্থ্যও নেই।
তিনি বর্তমানে ঘণ্টায় ২৫ ডলার আয় করলেও বহু বছর ধরে তার বেতন বাড়েনি। অথচ সানফ্রান্সিসকো অঞ্চলে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৩০ ডলারের বেশি।
শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করা সংগঠন ওয়ান ফেয়ার ওয়েজের সভাপতি সারু জয়রামান বলেন, ‘সম্পদ বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনও জোরদার হয়েছে।’ তার মতে, গত দুই দশকের মধ্যে শ্রমিক আন্দোলনে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে।
শিকাগোর স্টারবাকস কর্মী ও শিফট সুপারভাইজার সিয়েনা পাঙ্গান বলেন, ‘সাধারণ কর্মীদের আয় ও করপোরেট নির্বাহীদের আয়ের মধ্যে পার্থক্য এখন অত্যন্ত স্পষ্ট।’
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে একজন স্টারবাকস কর্মীর গড় বার্ষিক আয় ছিল ১৪ হাজার ৬৭৪ ডলার। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রায়ান নিকলের পারিশ্রমিক ছিল ৯ কোটি ৭৮ লাখ ডলার।
অক্সফাম ও ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে প্রধান নির্বাহীদের আয় বৃদ্ধির হার সাধারণ কর্মীদের তুলনায় ২০ গুণ বেশি ছিল।
পাঙ্গান বলেন, ‘অনেক কর্মী এখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিংবা বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতেই হিমশিম খান। অথচ অনেক করপোরেট প্রধান ব্যক্তিগত জেট ব্যবহার করে যাতায়াত করেন।’
তার মতে, বৈষম্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।